বিসিএস পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার কেন জরুরি

বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) ঘোষণা করেছিল, ৪৭তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা ২৭ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে শুরু হবে। কিন্তু এ লিখিত পরীক্ষার সময় পুনর্নির্ধারণের দাবিতে চাকরিপ্রার্থীদের একটি অংশ প্রায় এক মাস ধরে বিক্ষোভ করেছে। পিএসসির সামনে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচির পর তাদের আন্দোলন দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। তার পরও পিএসসি পরীক্ষা পিছিয়ে দিতে নারাজ। কমিশনের মতে, বিসিএস প্রস্তুতি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যা প্রার্থীর শিক্ষাগত পটভূমি এবং পড়াশোনার অভ্যাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। আর প্রতিবাদী প্রার্থীদের বক্তব্য, প্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তারা লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাননি, যদিও এগুলো তেমন শক্ত যুক্তি নয়।

বিসিএস পরীক্ষা সাধারণত তিনটি ধাপে অনুষ্ঠিত হয়– প্রাথমিক পরীক্ষার জন্য এমসিকিউ পরীক্ষা; সাধারণ ও বিশেষায়িত বিষয়ের সমন্বয়ে লিখিত পরীক্ষা এবং মৌখিক পরীক্ষা। এই কাঠামোটি প্রার্থীদের জ্ঞানের প্রশস্ততা ও গভীরতা পরীক্ষা করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এমসিকিউ পরীক্ষাটি মূলত সাধারণ জ্ঞান, ভাষা দক্ষতা (বাংলা ও ইংরেজি) এবং তথ্য মুখস্থ ক্ষমতার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। লিখিত পরীক্ষায় বাংলা ও ইংরেজি প্রবন্ধ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের ওপর বর্ণনামূলক প্রশ্ন, বিষয়ভিত্তিক প্রশ্ন এবং সাধারণ জ্ঞান অন্তর্ভুক্ত। পরিশেষে মৌখিক পরীক্ষাটি প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব, যোগাযোগ দক্ষতা, বৌদ্ধিক সক্ষমতা এবং সিভিল সার্ভিসের জন্য প্রার্থীর সামগ্রিক উপযুক্ততা মূল্যায়নের জন্য তৈরি করা হয়েছে। তবে ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন (ইউপিএসসি) পরীক্ষা, যুক্তরাজ্যের সিভিল সার্ভিস ফাস্ট স্ট্রিম (সিএসএফসি) পরীক্ষা এবং মার্কিন ফরেন সার্ভিস অফিসার টেস্টের (এফএসওটি) মতো বিশ্বব্যাপী সরকারি নিয়োগ পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা করলে বোঝা যায়, বিদ্যমান বিসিএস পরীক্ষা ব্যবস্থা লক্ষণীয়ভাবে ত্রুটিপূর্ণ এবং বেশ সেকেলে ধাঁচের।

বিসিএস পরীক্ষা পদ্ধতিটি ভারতের ইউপিএসসির মতো, যেখানে সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ওপর ভিত্তি করে সাধারণ জ্ঞানের মিশ্রণ করা হয় এবং বিশেষায়িত বিষয়ের প্রশ্নপত্র মুখস্থ করার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। তবে এটি যুক্তরাজ্যের সিএসএফএস পরীক্ষা পদ্ধতি থেকে আলাদা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এফএসওটি পরীক্ষা মূলত সমস্যা সমাধান, পরিস্থিতিগত বিচার-বুদ্ধি এবং নীতি-বিশ্লেষণ বা কেস স্টাডির ওপর বেশি জোর দেয়। এ কারণে বেশির ভাগ বিসিএস প্রার্থী পূর্ববর্তী বছরের প্রশ্নপত্রের সমাধানসহ স্টাডি গাইডের ওপর নির্ভর করে থাকেন। উত্তর মুখস্থ করে এবং প্রকৃত সমালোচনামূলক বা বিশ্লেষণাত্মক যুক্তি বা বৌদ্ধিক সক্ষমতা প্রদর্শন না করেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেন।

তা ছাড়া বিসিএস গাইড বইয়ের বিস্তার এবং দেশজুড়ে কোচিং সেন্টারের ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধির ফলে উত্তর মুখস্থ করার বিপজ্জনক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। প্রার্থীর সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার দক্ষতা, কার্যকরভাবে যুক্তি উপস্থাপনের সক্ষমতা এবং বাস্তব জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কৌশলকে বিসিএস পরীক্ষা পদ্ধতির অংশ হিসেবে এখন পর্যন্ত বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এই কাঠামোটি একটি ‘নিরাপদ এবং অতিরঞ্জিত’ হিসেবে সিভিল সার্ভিস ক্যারিয়ারের প্রতি অসামঞ্জস্যপূর্ণ আকর্ষণকে প্রতিফলিত করে, যেখানে সরকারি চাকরিতে সাফল্য প্রায়ই যে কোনো পাণ্ডিত্যপূর্ণ অর্জন বা বিশেষায়িত পেশাদারিত্ব অর্জনের চেয়ে বেশি মর্যাদাপূর্ণ বা মূল্যবান বলে মনে করা হয়।

বিসিএস পরীক্ষা ব্যবস্থার আরেকটি ত্রুটি হলো সীমিত ব্যবহারিক জ্ঞানের প্রাসঙ্গিকতা। লিখিত পরীক্ষার বেশির ভাগ প্রবন্ধ এবং বিষয়ভিত্তিক বর্ণনামূলক প্রশ্ন খুবই গতানুগতিক। এখানে চিন্তার গভীরতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জনস্বার্থে নীতিনির্ধারণের সক্ষমতার ওপর মনোযোগ দেওয়া হয়নি বললেই চলে। এই পুরোনো ধাঁচের, ভারসাম্যহীন লিখিত পরীক্ষা ইঞ্জিনিয়ারিং ও বিজ্ঞান অনুষদের প্রার্থী/স্নাতকদের মেধা তালিকা বা স্কোরিংয়ে মানবিক বা সামাজিক বিজ্ঞানের প্রার্থীদের চেয়ে এগিয়ে থাকতে সাহায্য করে। এ জন্য ইদানীং মেডিকেল এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকরা বিসিএস পুলিশ বা প্রশাসন সার্ভিসে বেশি যোগদান করছেন।

বিসিএস পরীক্ষার শেষ ধাপ হলো ভাইভা বা মৌখিক পরীক্ষা। যদিও এটি রাজনৈতিক পক্ষপাতমুক্ত নয়। যুক্তরাজ্যের মডেলে কাঠামো ও আচরণগত সাক্ষাৎকার অথবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্যানেলভিত্তিক দক্ষতা মূল্যায়নের বিপরীতে বিদ্যমান বিসিএস ভাইভায় স্বচ্ছ এবং মানসম্মত মূল্যায়ন কৌশল বা রুব্রিকের অভাব রয়েছে, যা সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থী নিয়োগের ক্ষেত্রে কাঠামোগত ত্রুটি, অসংগতি এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতের সুযোগ তৈরি করে।

একটি বিসিএস পরীক্ষার প্রক্রিয়া সাধারণত তিন-চার বছর সময় নেয়, যা স্নাতক/প্রার্থীদের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করে। পিএসসি ইতোমধ্যে ‘সার্কুলার সিস্টেম’ নামে একটি নতুন মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং একটি ‘বিসিএস ক্যালেন্ডার’ চালু করেছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে এক বছরে কমিয়ে আনবে। এখন পিএসসিকে এই ক্যালেন্ডার কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।

প্রার্থীদের গভীর জ্ঞান ও সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা মূল্যায়ন করবে এমন প্রশ্ন সেট করার জন্য অবশ্যই সংস্কার প্রয়োজন। সমস্যা সমাধানভিত্তিক প্রশ্ন এবং কেস স্টাডি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। মুখস্থ শেখাকে গুরুত্ব সহকারে নিরুৎসাহিত করা প্রয়োজন।

সীমিত স্বায়ত্তশাসনের অধিকারী বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন ইতোমধ্যে তার স্বাধীনতা প্রয়োগের জন্য একটি খসড়া সংশোধনী সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। বহিরাগত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়নে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চতর গ্রেডের জন্য কোটা ব্যবস্থা বাতিল করা হলেও স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক পক্ষপাত সম্পর্কিত অন্যান্য সমস্যা এখনও রয়ে গেছে। তবে এ এক ভালো পদক্ষেপ। পিএসসি প্রশ্ন ফাঁসের ঝুঁকি কমাতে একটি অভ্যন্তরীণ ডিজিটাল প্রিন্টিং প্রেস এবং মূল্যায়ন কেন্দ্র তৈরিতে কাজ করছে।

প্রকৃতপক্ষে একটি মেধাভিত্তিক, কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বিসিএস পরীক্ষা পদ্ধতিকে যুগোপযোগী এবং আধুনিক করা এখন সময়ের দাবি। আগামী দিনের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের নীতিনির্ধারক যারা হবেন, তাদের অবশ্যই প্রতিভাবান, দায়িত্বশীল ও সচেতন নাগরিক হতে হবে যাদের চিন্তার গভীরতা, সততা, নাগরিকের প্রতি সহানুভূতি এবং একবিংশ শতাব্দীর দক্ষতা রয়েছে।