চূড়ান্ত বিজয়ের আগে জাতিসংঘে যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব পাস

ঢাকার বাইরে একের পর এক এলাকা হানাদারমুক্ত হচ্ছিল। রণাঙ্গনে
পাকিস্তানিদের পরাজয় আসন্ন। স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জনের কাছাকাছি বাংলাদেশ। ঠিক সে
সময় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে পাস হয় একটি প্রস্তাব। যেটির আওতায় যুদ্ধ
বন্ধ করে পাকিস্তান ও ভারতকে সৈন্য প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়।
রণাঙ্গনে তখন মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে মিলে লড়াই করছিল ভারতীয় বাহিনী।
এমন অবস্থায় প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের অপেক্ষা হয়তো
আরও দীর্ঘায়িত হতো। প্রতিবেশীদের মধ্যে ভারত ও ভুটান স্বাভাবিকভাবেই প্রস্তাবটির
বিরোধিতা করে। কারণ, এক দিন আগেই তারা বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের
স্বীকৃতি দিয়েছে। আর পক্ষে ভোট দেয় চীন। তারা তখন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিপক্ষে
ছিল।
জাতিসংঘে ভোটাভুটি নিয়ে দুটি বার্তা সংস্থার বরাত দিয়ে ইত্তেফাক
লিখে, প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়ে ১০৪টি। আর বিপক্ষে ভোট দেয় ১১ সদস্য রাষ্ট্র।
প্রস্তাবটির একটি শর্তে বলা হয়, বাঙালি শরণার্থীরা যাতে স্বেচ্ছায় স্বদেশে
প্রত্যাবর্তন করতে পারে, পাকিস্তানকে সে রকম অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তবে এই
অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা নিয়ে আপত্তি ছিল পাকিস্তানের।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অধিবেশনে দেওয়া ভাষণেই
ইসলামাবাদের প্রতিনিধি আগা শাহি জানান, তাঁর সরকার ‘বাংলার বিদ্রোহীদের’ সঙ্গে
আলোচনায় রাজি নয়।
প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কতটা বাধ্যবাধকতা ছিল, তা নিয়ে
তখনই কূটনীতিকদের ব্যাখ্যা প্রকাশ করে নিউইয়র্ক টাইমস। এতে বলা হয়, প্রস্তাবটি পাস
হয় সাধারণ পরিষদে। ফলে এটি বাস্তবায়ন কেবল নৈতিক চাপ তৈরি করবে। যদি এটি নিরাপত্তা
পরিষদে পাস হতো, তাহলে বাস্তবায়নে বাধ্য করানো যেত।
মূলত সাধারণ পরিষদের আগে নিরাপত্তা পরিষদেও যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে
পৃথক প্রস্তাব তোলা হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো দুই পরাশক্তি রাশিয়া ও চীনের ভেটোর
কারণে বাতিল হয়। এরপর সাধারণ পরিষদের জরুরি অধিবেশন বসে।
৮ ডিসেম্বরের
রণাঙ্গন
কয়েক দিন ধরেই অবস্থা বেগতিক দেখে সটকে পড়ছিলেন পাকিস্তানের সেনা
কর্মকর্তারা। অনেকে নারায়ণগঞ্জ ও বরিশাল দিয়ে জলপথে পালানোর চেষ্টা করেন।
আনন্দবাজারের তথ্য, ঢাকা নগরীতে তখন ছিলেন শুধু মেজর জেনারেল ফরমান আলি। তিনি
ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর এ এম মালিকের উপদেষ্টা ও সহকারী সামরিক
প্রশাসক।
আনন্দবাজার লিখে, প্রমত্তা পদ্মার তীরে দাউদকান্দিতে ঢাকামুখী
সেনারা ঘাঁটি করেছে। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনারা দক্ষিণ-পশ্চিমে যশোর দিয়ে,
উত্তর-পশ্চিমে রংপুর হয়ে, পূর্বে সিলেট এবং মধ্যভাগে ময়মনসিংহের ভেতর জামালপুর
দিয়ে ঢাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। আখাউড়া থেকে একটি দল কুমিল্লা এবং আরেক দল
পৌঁছেছে চাঁদপুরে। রংপুর থেকে ২৮ মাইল দক্ষিণে পীরগঞ্জে ছিল আরেকটি দল।
সাতক্ষীরা, মাগুরা,
কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া মুক্ত
শত্রুমুক্ত হওয়া এলাকাগুলো সম্পর্কে আনন্দবাজার জানায়, এদিন
বিমানঘাঁটিসহ কুমিল্লা শহর শত্রুমুক্ত হয়। ময়নামতি সেনানিবাস দখলের জন্য লড়াই
চলছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়াও মুক্ত। দক্ষিণ-পূর্ব রণাঙ্গনে মাগুরা, সাতক্ষীরাও স্বাধীন
হয়। উত্তর-পূর্ব রণাঙ্গনে সৈয়দপুরের উত্তর ভাগ মিত্রবাহিনী অধিকারে নেয়। অন্যদিকে
চট্টগ্রামের রামগড়ে শত্রুদের হটিয়ে দেয় মুক্তিবাহিনী।
৮ ডিসেম্বর রাতের মধ্যে মুক্ত হয় যশোর খণ্ডের রূপদিয়া-লেবুতলা,
কুমিল্লা অংশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেটের শ্রীমঙ্গল, রংপুর-দিনাজপুর খণ্ডের
দুর্গাপুর ও বাদুড়িয়া। আনন্দবাজার লিখে, কুষ্টিয়া শহর ঘিরে ফেলে রাজশাহী ও পাবনার
মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় মিত্রবাহিনী। মেহেরপুর মুক্ত করে মিত্র ও
মুক্তিবাহিনী চুয়াডাঙ্গার ওপর ক্রমাগত গোলাবর্ষণ করে। খুলনা শহরেও তা অব্যাহত ছিল।
এদিন মুক্ত যশোরে জেলা প্রশাসক হিসেবে ওয়ালিউল ইসলামকে নিয়োগ দেয় মুজিবনগর সরকার।
লাহোর থেকে
মুজিবনগরে
পশ্চিম পাকিস্তানে থাকা দেড়শ বাঙালি সৈন্য ৮ ডিসেম্বর
মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন। ৫ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্টের এই সৈনিকরা লাহোরে নিযুক্ত
ছিলেন। ওই সেক্টরে ইয়াহিয়া খান যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা দেওয়ার পর চার অফিসারসহ দেড়শ
সৈন্য মর্টার, স্টেনগান ও প্রচুর গোলাবারুদ নিয়ে হোসেনওয়ালা সীমান্ত হয়ে ভারতে
পৌঁছান। পরে মুজিবনগরে গেলে তাদের স্বাগত জানান মুক্তিবাহিনীর প্রধান কর্নেল এমএজি
ওসমানী (আনন্দবাজার, ৯ ডিসেম্বর)।
টর্চলাইট কেনার
হিড়িক
জাহানারা ইমাম তাঁর ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইয়ে লিখেছেন, ৮ ডিসেম্বর
বুধবার রেডিওতে আবার ঘোষণা দেওয়া হয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কারফিউ ও
ব্ল্যাকআউট (সন্ধ্যা থেকে ভোর ৫টা) বলবৎ থাকবে।
ডিসেম্বরের শুরুর দিক থেকেই ঢাকায় কারফিউ ও ব্ল্যাকআউট জারি হয়। ৮
ডিসেম্বর নতুন করে ঘোষণা দেওয়ার পর এর প্রভাব পড়ে টর্চলাইটের বাজারে। এ নিয়ে পরদিন
দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় লেখা হয়, ঢাকাসহ আশপাশে নিষ্প্রদীপ ব্যবস্থা চালু হওয়ার
পর জনসাধারণের মধ্যে টর্চলাইট ও টর্চের ব্যাটারি কেনার হিড়িক পড়েছে। শহরের বিভিন্ন
মণিহারি দোকানে টর্চের যে মজুত ছিল, তা শেষের দিকে। পেনসিল ব্যাটারির যে টর্চ
কিছুদিন আগে ছয় টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেগুলো পৌনে আট থেকে সাড়ে আট টাকায় বিক্রি
হচ্ছে।







