কোন গুপ্তধনের লোভে বিপ্লবের ঐক্যে ফাটল!

কৈশোরে আমরা প্রায়ই ইংরেজি সিনেমা বা সিরিয়ালে দেখতাম, এক দল মানুষ গুপ্তধনের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছে। প্রায় সব সমাজেই গুপ্তধনের সন্ধ্যানে বেরিয়ে পড়ার গল্প, উপন্যাস আছে। এ নিয়ে সিনেমাও তৈরি হয়। এটি মূলত শিক্ষামূলক ধ্রুপদি কল্পকাহিনি।
গুপ্তধনের সন্ধানে বেরিয়ে পড়া দলটি নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে বিভিন্ন রকমের শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করে। এসব দুর্যোগে বা যুদ্ধে তাদের শক্তি ও সম্পদের ক্ষয় হয়; কিছু সঙ্গী প্রাণ হারায়। যারা বেঁচে থাকে তাদেরও অনেকে আহত হয়। এর পর কোনো রহস্যময় দ্বীপে গিয়ে পৌঁছে। সেখানেও পায়ে পায়ে ওত পেতে আছে হাজারো বিপদ। অরণ্য-মানুষের আক্রমণ, হিংস্র জন্তুর আক্রমণ, অশরীরী আত্মার ভীতিসহ কত কী! এসব পার হতে আরও কিছু সঙ্গীর মৃত্যু হয়।
এ রকম সিনেমা দেখে খুব কষ্ট পেতাম। আহা! বেচারারা এত কষ্ট করে লক্ষ্যে পৌঁছানোর পর সম্পদ উপভোগ করতে পারল না! কী দরকার ছিল একাই মালিক হওয়ার লোভে নিজেদের মধ্যে মারামারি করে শেষ হয়ে যাওয়ার? এ প্রশ্নের মধ্যেই কৈশোরের চিন্তা ঘুরপাক খেত।
এখন বুঝতে পারি– ধ্রুপদি গল্প, সিনেমার মূল লক্ষ্য পাঠক ও দর্শকের অন্তরে এই বোধ জাগ্রত করা– লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। গুপ্তধনের কাছে পৌঁছানোর আগমুহূর্ত পর্যন্ত সব বিপদ ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা এবং প্রতিবারই জয়লাভ। যখনই ঐক্য ভেঙে যায়, সবাই মারা পড়ে। অনৈক্যে শক্তি ক্ষয় এবং সবারই অকল্যাণ। ধ্রুপদি গল্প বা সিনেমার এটাই শিক্ষা।
গত ৫ আগস্ট বাংলাদেশের তরুণ ছাত্র-জনতার বিপুল বিজয়ের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটে। কিন্তু গুপ্তধনের মালিক কে হবে, অর্থাৎ কে কোন পদে বসবে কিংবা কেন আমি কিছু পেলাম না; আমিও তো আন্দোলনে ছিলাম– এই আহাজারিতে বিপ্লবের ঐক্যে ছোট ছোট অসংখ্য ফাটল দেখা দিয়েছে। যে ত্যাগের মহিমায় প্রত্যয়ী হয়ে মৃত্যুকে বরণ করার জন্য পুলিশের বন্দুকের সামনে বুক পেতে দিয়েছিল ছাত্র-জনতা; হাসিনা-সরকারের পতন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেই আত্মত্যাগের শপথ, দেশপ্রেমের প্রত্যয় হাওয়ায় মিইয়ে গেছে।
যারা সচিবালয়ে আছেন তাদের উচিত হবে গরিব দেশের মানুষের সামনে বিলাসী জীবনযাপন প্রদর্শন না করা; দামি ফোন, মাথায় ছাতাধরা লোক, দামি গাড়িতে চড়া, দামি পোশাক ইত্যাদি পরিহার করা। যাতে রাজপথের সহযোদ্ধারা তাদের উঁচু শ্রেণির মানুষ ভেবে ঈর্ষাকাতর হওয়ার সুযোগ না পায়।
শুধু মুখে মিষ্টি কথা বললে মানুষ বিশ্বাস করবে না। তাদের প্রতিটা পদক্ষেপে প্রমাণ করতে হবে– তারা এখনও রাজপথের যোদ্ধাদের মতোই সাধারণ বিপ্লবী। এদের আর তাদের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কোনো পার্থক্য নেই। এটা নিশ্চিত করতে না পারলে গুপ্তধন, মানে পদ-পদবির লোভ, নিজেদের মধ্যে মারামারিতে গণঅভ্যুত্থানের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে। নতুন ফর্মে নতুন কোনো ফ্যাসিবাদ আগের ফ্যাসিবাদের স্থলাভিষিক্ত হবে।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না– রাষ্ট্র সংস্কারের এক মহান শপথ নিয়ে; এ দেশের মানুষকে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার যাত্রা শুরু করেছে। কোনোভাবে আইনের দোহাই দিয়েই হোক কিংবা রাজনৈতিক শক্তির ভয়েই হোক, সেখান থেকে এক চুলও বিচ্যুত হওয়া যাবে না।
কাজী জহিরুল ইসলাম: কবি, কথাসাহিত্যিক








